এইচএসসির পর | কী পড়বে কেন পড়বে

by poster on April 25, 2010

এখন ওরা ব্যস্ত। দিনরাত একাকার করে শুধুই পড়া। আর তারপর? সব ঝেড়েঝুড়ে দিয়ে আসছে পরীক্ষার হলে। তাই বলে কি ভাবা হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলেই তাদের চিন্তা শেষ। না। আসল ভাবনা তখনই শুরু। এবার কোথায় পড়ব? কী নিয়ে থাকব আরও চারটা বছর? মেডিকেলে ভর্তি হব নাকি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব। বিবিএ, কম্পিউটার সায়েন্স, ইংরেজি, আইন, অর্থনীতি থেকে হালের ফ্যাশন ডিজাইন পর্যন্ত সবকিছুতেই নজর এখন তাদের। এগুলো ছাড়াও রয়েছে আরও কত্ত বিষয়। নিজের পছন্দের বিষয়টাতে ভর্তি হতে পারলেই তবে স্বস্তি।

দ্বিধা না মনের আনন্দ
ছোট্ট দুটি হাতের মধ্যে চক দিয়ে কালো স্লেটের ওপর ক-খ-গ-ঘ শেখানোর জন্য বাবা-মায়ের আপ্রাণ চেষ্টা। কিছু শেখার এ আগ্রহই শৈশবের পড়াশোনার গতিকে ধাবিত করে। কিন্তু একটা সময় এসে দুনিয়ার ভেতর অহর্নিশ ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আর টানে না। খাতায় লাল কালির দেওয়া নম্বরগুলোই এখন জীবন-মরণের প্রশ্ন। ভালো একটি চাকরির জন্য এটিই যে দরকার।

সাফায়রা আহমেদ এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। কমার্সের এই পরীক্ষার্থী জানে তাকে ভর্তি হতে হবে বিবিএর ফাইন্যান্সে। যদিও তার মন আটকানো মানবসম্পদ বিভাগে। কিন্তু বাবা-মায়ের ইচ্ছে যে অন্য কিছুতে। ‘চাকরির ক্ষেত্রে মানবসম্পদ বিভাগের মূল্য এখন অনেক। কিন্তু বাবা-মা ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না। তাঁদের বোঝাতে এখন পুরো চাকরির বাজারের হালহকিকতই তুলে ধরব। তবে এখন নয়। পরীক্ষার পরই শুরু করব আমার মিশন।’ চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা সাফায়রা জানায়।
একজন, দুজন নয়, অনেক সাফায়রা আটকে আছে এ রকম দ্বিধাদ্বন্দ্বে। পড়াশোনা করে তো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যই। এ বিষয়টিকে অস্বীকার করার কিছু নেই। বিষয় তো অনেকগুলোই আছে। কিন্তু কোনটি পড়া উচিত? যেখানে চোখ-মুখ বুজে শুধুই নম্বর তোলা যাবে। নাকি যেটা পড়তে গিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে শুধুই মনের আনন্দ।

কিসের চাপে বন্দী ওরা
প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। তাহলেই পাবে ভালো চাকরিটা। সমাজের অলিখিত নিয়ম এটা। বিষয়গুলো তাই বাছা হয় সেভাবেই। অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষাটা বর্তমানে একপেশে হয়ে যাচ্ছে। ‘শিক্ষার্থী কী শিখল, তার চেয়ে বড় হয়ে যায় সামনে কী পাবে। শিক্ষাব্যবস্থাটাই এখন বাণিজ্যিক হয়ে গেছে।’ বলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।
এ রকম চিন্তা নিয়ে আর কয়েক দিন চললে সীমা আজাদের পড়াশোনাটা গোল্লায় যেত। পরিবারের পছন্দ অনুযায়ী ভর্তি হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএতে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে হওয়ায় কোনোমতেই ভালো ফলাফল করতে পারছিলেন না। শেষে পরিবারকে বোঝাতে লেগে গেলেন। অবশেষে বাবা-মায়ের অনুমতি মিলল। এখন সীমা আজাদ ফ্যাশন ডিজাইনের ছাত্রী। মনের সাধ মিটিয়ে কাপড়ের ওপর, কাপড় কেটে নকশা করে যাচ্ছেন। ‘পড়ায় মন বসত না। ক্লাসে কিছুই বুঝতাম না। একসময় বাধ্য হয়ে বদলে নিয়েছি বিষয়টি।’ জানান সীমা।

‘প্রাথমিকে অনেক ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়। কিন্তু তাদের ধরে রাখাই মুশকিল হয়ে যায়। সাধারণ হিসেবে দেখা যায়, ১০০ জনের মধ্যে ২৭ জন ছাত্রছাত্রী উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে চাকরির বাজারের কথা মাথায় রেখেই তারা বিষয়গুলো বেছে নেয়। কৃষিতে আমাদের এখন দরকার নতুন প্রযুক্তি, দরকার জনশক্তি। এটি একটি সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র। গণিত বিষয়টির দিকেও আমরা তেমন একটা সাড়া পাচ্ছি না। অন্যদিকে প্রথাগত চাকরিগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে মেয়েরা বেশি। এর একটি কারণ হলো পারিবারিক ও সামাজিক। আরেকটি কারণ ওরা নতুন কিছুতে ঢুকতে উৎসাহ পায় না।’ জানান রাশেদা কে চৌধুরী।
তবে সাইফুর রহমান মনের আনন্দ খুঁজে পাবেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টিতেই। বুয়েটে ভর্তির উদ্দেশ্যেই তাই শুরু হবে সব চেষ্টা। ‘নতুন কিছু করার আনন্দই আমাকে উৎসাহিত করছে এ বিষয়টিতে পড়তে।’ জানান তিনি।

কী পড়ব, কী পড়ব না
একটু চিন্তা করে দেখলে সব বিষয়ই ভালো। প্রতিটি বিষয়েরই দাম আছে। কিন্তু সেটা আটকে আছে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মক্ষেত্রের জনপ্রিয়তায়। অনেক মেধাবী মানুষ বিখ্যাত হয়েছেন বর্তমানে অবহেলিত বিষয়গুলোর ভেতর দিয়েই। সেদিকটি তুলে ধরেন চারদিক আলোকিত করার চেষ্টায় নিমজ্জিত আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেন, ‘আনন্দের জন্য হলে, মানুষের উপকারের জন্য হবে, এমন সব বিষয়ই ভালো।’

অভিনয়শিল্পী আলী যাকের জানান, ‘গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত অর্থনীতি, দর্শন, মনস্তত্ত্ব, সাহিত্য, বাংলা, ভূগোল প্রভৃতি মৌলিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা দরকার। ভালো ফলাফল করলে যেকোনো বিভাগ থেকেই ভালো চাকরিতে ঢোকা সম্ভব।’

মানবিক থেকে পাস করে সাধারণত অর্থনীতি, ইংরেজি, আইন বিভাগে ভর্তি হতে চায়। কমার্স থেকে পাস করে আইবিএ, ফাইন্যান্স, মার্কেটিংয়ে পড়তে আগ্রহী হয়। সরকারি না হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোজা ঢুকে গেলেই হলো। অপর দিকে বিজ্ঞান থেকে মেডিকেল, স্থাপত্য, প্রকৌশল, মেডিসিন, ফার্মেসি, অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স, বায়োকেমিস্ট্রি, টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন বিভাগে ভর্তি হওয়ার টার্গেট থাকে। সঙ্গে আছে বুয়েট। পছন্দমতো বিষয়ে ভর্তি হতে না পারলে তখন? লেদার টেক্সটাইল, ইন্টেরিয়র ডিজাইন অ্যান্ড আর্কিটেকচার, ফ্যাশন ডিজাইনসহ বিভিন্ন বিষয় খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। পরমাণুবিজ্ঞানী, চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্স, এসিসিএ, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি, গণমাধ্যমসহ অনেক মজার মজার বিষয় আছে।

সাধারণ বিষয়ে পড়ে শিক্ষকতা, বিসিএস পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা, ভালো থেকে ভালো চাকরির সুযোগ—সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়ে যখন তুমি সেটা আনন্দ নিয়ে করবে না। বিজ্ঞান থেকে পাস করলেই যে সে বিষয়েই থেকে যেতে হবে, তা কিন্তু নয়। মন না চাইলে অনায়াসে বদলে ফেলতে পার বিষয়টিকে। মানবিক ও কমার্সে এ সুযোগটা একটু কম হলেও আছে। একটু সাহস করে নতুনত্ব নিয়ে না হয় চিন্তাই করলাম। গতানুগতিক ধারায় গেলেই জীবনে সাফল্য আসবে—এ ধারণাটি একদমই ভুল। চাকরির জন্য নয়, কিছু শেখার জন্যই না হয় শুরু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পথচলা।

রয়া মুনতাসীর | দৈনিক প্রথম আলো | ২৫ এপ্রিল ২০১০

Digg This
Reddit This
Stumble Now!
Buzz This
Vote on DZone
Share on Facebook
Bookmark this on Delicious
Kick It on DotNetKicks.com
Shout it
Share on LinkedIn
Bookmark this on Technorati
Post on Twitter
Google Buzz (aka. Google Reader)

Leave a Comment

Previous post:

Next post: